skip to main |
skip to sidebar
ভাদ্রের শেষ বিকেলের রদ্দুর
বিদায় নেবার আগে
হাঁটু মুড়ে বসলো জানালায়।
চোখে তার স্বচ্ছ
নীল আকাশ,
করতলে শিউলির সুবাস। কাল মহালয়া।
মায়ের আগমনের বারতা
জানাতে এসেছে সে।
কিন্তু দু চোখে এত বিষাদ কেন?
চোখের জল লুকালো,
রদ্দুর মুখ ফেরালো।রাত এলো
ভয়ানক রূপ ধরে।
বোমার গর্জন, আহতের আর্তনাদ,
মৃত্যুর নিস্তব্ধতা।
শিউলির শুভ্রতায় লালের দাগ,সুরে বিষাদের রাগ।আশ্বিনের শিরশিরে নরম ভোর
আশা জাগায় আগামীকালের।
দুর্গতিনাশিনীর ত্রিশূলাঘাতে
হবে নাশ
আতঙ্কবাদের ভাষা,
ফিরবে আশা, ফিরবে ভালবাসা।
বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজ মেলাবার আগেই এক দঙ্গল ছোট ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়লো গঙ্গায়। তাদের বয়স সাত থেকে পনেরো। মায়ের গয়না, অস্ত্র, কাঠামো, যে যা পারছে উদ্ধার করছে। স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে তারা কাড়াকাড়ির উল্লাসে মেতে উঠেছে। এর বিনিময় কিছু টাকা রোজগার করা যায় প্রতি বছর।
ভোলা এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। এই তার রোজগারের প্রথম প্রচেষ্টা। অন্যদের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছুই যোগার করতে পারলো না সে। ক্লান্ত ভোলা হাঁপাতে হাঁপাতে যখন ডাঙ্গার কাছে পৌঁছে গেছে, ছোট্ট একটা মাটির ঢেলা হাতে এসে ঠেকলো। ভোলা তুলে নিয়ে দেখে মা দুর্গার ভাঙ্গা মুখ। একটা কান নেই, দু ছড়া চুল কোনোরকমে আটকে আছে, নাক চটে গেছে, একটা চোখ ধুয়ে বিবর্ণ। কিন্তু সে আশ্চর্য হয়ে দেখে, ত্রিনয়নীর তৃতীয় নয়ণ সজীব হয়ে জ্বলজ্বল করছে, যেন এইমাত্র তুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে। ভোলা মুখখানা গামছায় বেঁধে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
আজকাল তার বাড়িতে থাকতে একদম ভাল লাগে না। রোজ রাতে বাবা মাতাল হয়ে মাকে অশ্রাব্য গালাগাল দেয়, মারধরও করে। মায়ের যন্ত্রনাকাতর চোখদুটো আর ছোট ছোট তিনটে ভাইবোনের ভয়ার্ত কান্না তাকে তাড়া করে ফেরে। পয়সার অভাবই যে সব কিছুর মূলে, ছোট্ট ভোলা তা বুঝে গেছে। তাই সে ঠিক করেছে কিছু রোজগার তাকে করতেই হবে। মায়ের স্বপ্ন ভোলা লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হলে তাদের দুঃখের দিনের অবসান ঘটবে।
সে রাতেও বাবার রণচন্ডি মূর্তি দেখে আর জড়ানো গলায় গালাগাল শুনে ভাইবোনেরা চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। বাবা টলতে টলতে এসে সজোরে তাদের গালে ঠাস ঠাস করে থাপ্পর মেরে মায়ের চুলের মুঠি ধরে দেওয়ালে ঠুকে দিলেন। সব মায়ের দোষ - বেকারত্ত্ব, এতগুলো অকালকুষ্মান্ড জন্ম দেওয়া, দুবেলা ঠিকমত খেতে না পাওয়া, সব সব।
ভোলা কানে আঙ্গুল দিয়ে ঘরের কোনায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। সন্তর্পনে গামছা খুলে মায়ের মুখখানা চোখের সামনে ফিসফিস করে বলল, তোমার তো তিনটে চোখ, কিছুই দেখতে পাও না?
হঠাৎ মায়ের ত্রিনয়ন থেকে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে চারিদিক আলোকিত করে তুললো। যেন হাজার ঢাকে কাঠি পড়লো। শঙ্খ আর উলুদ্ধ্বনিতে চতুর্দিক মুখরিতো। পুরুত মশাইয়ের ধুঁনুচির ধোয়ায় সামনেটা আচ্ছন্ন।
ধীরে ধীরে ধোঁয়ার পর্দা সরে গেল। নজরে এল টলটলে একটা দীঘি, নারকেল গাছের সারি। ধবল গাইরা কৃষ্ণচূড়া গাছে তলায় বসে নিশ্চিন্তে জাবর কাটছে। দীঘির ধারে ওরা কারা বসে? হ্যাঁ, ঐ তো তার মা বাবা! বাবার পরনে পরিষ্কার হাফ হাতা শার্ট আর পাজামা। মায়ের চুলে বাহারি খোঁপা, গায়ে ডুরে শারি। ভালবাসার প্রতীক যেন তারা। হাতে হাত রেখে মা লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে নতমুখে বসে আছেন আর বাবা সজত্নে তাঁর কপালে উড়ে আসা চুল সরিয়ে দিচ্ছেন।বাবা মাকে এত ভালবাসেন? তাহলে এখন কেন এমন বদলে গেছেন? অভাব? ব্যর্থতা? অক্ষমতা? তাই হবে!
ঐ তো! মাঠে ওরা চার ভাইবোন খেলা করছে। সকলের গায়ে ফর্সা ছিটের জামা, মুখে তৃপ্তির হাসি। রঙ্গিন প্রজাপতির মত ছুটে বেড়াচ্ছে। খেলতে খেলতে ছুটকি পড়ে গিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো। মা বাবা ছুটে এলেন ওদের কাছে। বাবা ছুটকিকে কোলে তুলে একটা হামি দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। ওমনি ছুটকি চুপ। বাবার গলা জড়িয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো।
চার ভাইবোন মা বাবার হাত ধরে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরলো। তারপর মা যত্ন করে কত কি রাঁধলেন! ডাল, শুক্ত, মাছ, মাংস, চাটনি, পায়েস। এত সব খাবার একসাথে কখনই খায়নি তারা। মায়ের হাতের রান্নার কি স্বাদ! সকলকে বেড়ে ছুটকিকে খাওয়াতে বসলেন মা। ভোলা তৃপ্তি সহকারে খেতে খেতে দেখলো বাবা মায়ের দিকে চেয়ে হাসছেন আর বলছেন, অনেক পুণ্যি করে তোমায় পেয়েছি। মায়ের মুখখানা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো।
খাওয়া দাওয়া সেরে ভাইবোনেরা মা বাবার মাঝখানে শুয়ে পড়লো। কত গল্প শোনালেন ওঁরা। রাজা রানির গল্প, রাক্ষসের গল্প, পরিদের গল্প। শুনতে শুনতে কখন যে চোখ দুটো ঘুমে ভারি হয়ে এসেছে টেরই পায়নি ভোলা।
ঝনঝন করে বাসন ছোঁড়ার আওয়াজ আর মায়ের ‘মা গো’ বলে রক্তাক্ত কপাল চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কান্না ভোলার কানে পৌঁছালো না।
সে এখন মা দুর্গার তৃতীয় নয়নের আলোকপথ ধরে দূর রাজ্যে পৌঁছে গেছে, যেখানে সে ভালবাসার আলো গায়ে মেখে, ফুসফুস ভরে বিশ্বাসের বাতাস টেনে সুখের ঘাস-গালিচায় নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ভোলার আলগা হয়ে যাওয়া হাতের মুঠোয় মায়ের ভাঙ্গা মুখে, ত্রিনয়নের উপর টলটল করছে ওর চোখের কোন থেকে গড়িয়ে আসা এক বিন্দু জল।
ছোট্ট মেয়ের ডাগর চোখে
মরুভূমি সাজে ,
জলপ্রপাত নদী সাগর
হারায় বালির ভাঁজে।
রূপকথার ঐ দৈত্য দানব
প্রায় আসে তার কাছে,
দাঁত নখ দিয়ে খুবলে লুকায়
আত্মীয়তার মাঝে।
বলবে কাকে? সাপের ফণা
শাসায় ছোবল মেরে,
বোবা ঠোঁটের আর্তনাদে
শৈশব নেয় কেড়ে।
বাইরে মানব ভিতর দানব
সুযোগ পেলেই তেড়ে
গিলতে আসে, হোক না শিশু!তাকেও দেয় না ছেড়ে।
মাকড়শার জালের
সু-কৌশল বুনটে
আটকে গেছিলো দৃষ্টি।
কবে, ঠিক মনে পড়েনা।
এক সুতো থেকে
আরেক সুতোয়
জড়াতে জড়াতে
আমি এখন
ঐ জালেরই এক নক্সা।
চেষ্টা করেছি,
বোধ অনুভূতির
শাবলাঘাতে
সুড়ঙ্গ কেটে বেরোনোর।
ঘন কুয়াশায় হারিয়ে যাই।
কদাচিৎ,
রোদের স্পটলাইটে
আবছা দোতলা বাড়ি,
চেনা চেনা মা ডাক।
পরক্ষণেই,
মুশলাধার বৃষ্টির
দেওয়াল চারিধারে।
একা আমি,
রামধনুর কাছে ধার করে
শিশিরে রঙ ভরি,
মেঘের পোষাক বানাই।
কারা যেন আসে যায়।
জাল কেটে
মুক্ত করার চেষ্টা।
পারে না।
আমি যে এখন
নিজেই বুনি নিরন্তর,
মাকড়শার জালের চেয়েও
সুন্দর, ঘন, নিশ্ছিদ্র।
সাদা পোষাক আরঅষুধের গন্ধের সাথে
একটি শব্দের আনাগোনা......'য়্যালজাইমার'।
ভোর থেকে হয় শুরু
গর্জন গুরু গুরু,
কর্তা গিন্নি তার সপ্তকে
ঝগড়া করেন শুরু।
(ভোর)
সারারাত ডাকো নাক
যেন জোড়া জয়-ঢাক,
চোখের পাতা এক করে দায়
আমারই রটন লাক!
(সকাল)
আজও ভুললে ঝিঙ্গে
রুই না এনে শিঙ্গে?
ফুলকফি বেমালুন ভুলে
এক গাদা চিচিঙ্গে।
(দুফুর)
এ কী রান্নার ছিরি
নুনকাটা বিচ্ছিরি!
থালা বাটি ছুঁড়ে কর্তা
ধরান রেগে বিড়ি।
(ভর-দুফুর)
বেহাগ সুরে কান্না
এ সংসারে আন্না!
আজই যাবো জাহান্নামে
নিজেই কোরো রান্না।
(সন্ধ্যা)
সন্ধ্যাবেলায় রিমোট
কেন্দ্র করে বিস্ফোট,
সিরিয়াল না খেলা দেখবে
এই নিয়ে ঘনঘোট।
(রাত)
মশারি টাঙ্গাবে কে?
রোজ আসো দেরিতে,
মশার কামড়ে প্রাণ যায় যায়
সব কাজেতেই ‘ইয়ে’।
ষাঠ বছরের লড়াই
শুনছি পাড়ার সবাই,
কিন্ত দাদা বৌদির মতপ্রেমিক আমরা থোরাই?
ভোরের লালিমা গালে,
সোনালি রোদের অভ্র
ছড়িয়ে চোখের পাতায়,
সাতরঙ্গা প্রথম চুম্বন।
বসন্তের মদিরার নেশায়,
বাঁধ ভাঙ্গা জলোচ্ছাসে
ভেসে যায় সংযমের ভেলা,
মুছে যায় নিষেধের গন্ডি।
মধ্যাহ্ণের দাবানল পুড়িয়ে দিয়ে
চলে যায় অন্যত্র, অন্যখানে।
কুমারি মরুভূমির বুকে
স্তব্ধ সূর্যাস্ত।
ভোর থেকে রাত অমাবশ্যা,
খরকুটো ধরে বাঁচা,
গর্ভের ঐ এক ফালি চাঁদ
এক আকাশ পূর্ণিমা।
এলো চুলে অপমানের জট,
লুটাচ্ছে লাঞ্ছনার আঁচল।
অত্যাচারের ট্যাটু
শরীর জুড়ে নক্সা।
এক যুগ কান্নার সমূদ্র,
অতলে তলিয়ে যাবার
তীব্র বাসনা।
এক সারি আহ্লাদি ঢেউ
আঁছড়ে পড়ে পায়ের ওপর।
সমাজের প্রতিক হয়ে
চাইলো ক্ষমা।
আলতো আঙ্গুলে ছাড়ালো জট
মুছে দিয়ে নক্সা
খুলে দিলো শেকল।
ফেনিল জলে সমাধি হলো
ভয় দুর্বলতা আপোস।
ভিজে বালুচরে
জোড়া পদচিহ্ন,
বলিষ্ঠ, আত্মবিশ্বাসে ভরা।
ঋণ পরিশোধের অঙ্গিকারে,
সমূদ্রকে পিছনে ফেলে
জনারণ্যের দিকে।